না বলি , না বলতে শিখি

 

“না” বলা ?? এটা তো পানির মত সহজ! প্রতিদিনই তো কতবার না বলছি!! এটা আবার শেখার কি হলো???

কথা সত্য; আমরা সারাক্ষণই প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে না কথাটি বলছি। আমার মনে হয় আমরা সারাজীবনে যত বার হ্যাঁ শব্দটা বলি তার চেয়ে কয়েক গুন বেশী বলি না শব্দটা। এই বহুল ব্যবহৃত শব্দটা নতুন করে শেখার আসলেই কিছু নেই। আমি আসলে এখানে “সুন্দর করে না বলা” বা “না বলার আর্ট” নিয়ে বলতে চাচ্ছি।

না হচ্ছে সবচেয়ে প্রথমে শেখা, সবচেয়ে সহজ এবং একদম সরাসরি একটি নেগেটিভ শব্দ। আপনি যখন সরাসরি কাওকে কোন ব্যাপারে না বলেন, নিশ্চিত ভাবে সে আপনার প্রতি মনঃক্ষুণ্ণ বা বিরক্ত হয়। কারণ এতে আপনি তার মনের ইচ্ছাটার বিরুদ্ধে মতামত দিচ্ছেন। কিন্তু একটু কৌশল করে বা একটু সুন্দর করে যদি না বলতে পারেন তাহলে দেখা যাচ্ছে আপনার কাউন্টারপার্টটি হয়ত আপনার সমর্থন পেল না কিন্তু সে আপনার উপর সে রাগও করতে পারবে না; বরং আপনার ব্যক্তিত্যের প্রতি তার সম্মান বেড়ে যাবে।

যেমন ধরুন আপনাকে কেও প্রেমের প্রস্তাব দিল ;); কিন্তু আপনি তার প্রস্তাবে সম্মত হতে পারছেন না। আপনি যদি তার মুখের উপর না বলে দেন তাহলে সে স্বভাবত-ই মনে অনেক কষ্ট পাবে। হয়ত এর ফলে আপনাদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কটিও সারাজীবনের জন্য শেষ হয়ে যাবে। তাছাড়া একজন মানুষ আপনার প্রতি তার হৃদয় নিংড়ান অনুভূতি প্রকাশ করল, আপনার কি উচিত হবে তার মনে এত বড় একটা আঘাত দেওয়া? ভেবে দেখেন তো, আপনি যদি কারো কাছ থেকে এমন ব্যবহার পেতেন তবে কেমন লাগত! সুতরাং এমন একটা উপায় বের করুন যাতে আপনি আপনার অপারগতার বিষয়টি তাকে বুঝাতে সমর্থ হন।

আবার ধরুন, আপনার বন্ধু আপনার কাছ থেকে টাকা ধার চাইল; কিন্তু তাকে টাকাটা দিলে আপনার টানাটানি পড়ে যাবে বা আপনি চাচ্ছেন না বন্ধুত্বের মাঝে টাকা পয়সার লেনদেন হয়ে বন্ধুত্ব নষ্ট হোক! আপনি তাকে সরাসরি না বললে বন্ধুত্ব এমনিতেই নষ্ট হইয়ে যাবে; তাই এমন একটা উপায় বের করুন যাতে সাপও মরে লাঠিও না ভাঙ্গে!

কর্মজীবনে ঊর্ধ্বতন আর অধস্তন মানুষের সাথে কাজ করতে গিয়ে সুন্দর করে না বলতে পারাটা খুবই জরুরী। আপনি যদি একদম-ই না বলতে না পারেন তাহলে আপনাকে সবাই ভাঙ্গিয়ে খাবে, গাধার খাটুনি খাটতে খাটতে আপনার জীবন শেষ! আর যদি কর্কশ ভাবে না বলেন তাহলে অফিসে আপনার রেপুটেশন নষ্ট হবে, যা আপনার ক্যারিয়ারের জন্য ক্ষতিকর।

উন্নত দেশগুলোতে কর্পোরেট বিহেভিয়ার শেখানোর সময় কেমনে দু’কুল রক্ষা করে “No” বলতে হয় সেটা শেখানো হয়। এটা হচ্ছে ডিপ্লোম্যাসি; ডিপ্লোম্যাসি আর মিথ্যা কথা এক জিনিস নয়। জীবনে পজিটিভ ডিপ্লোম্যাসির প্রয়োজনীয়তা অনেক।

আমি নিজেও সুন্দর করে না বলতে পারিনা, প্রকৃতপক্ষে, আমি একদমই না বলতে না পারাদের দলে; 😉 এই তো সেদিন, আমার কাছে একজন বেশ কিছু টাকা ধার চাইল; আমি জানি যে আমি যদি তাকে আমি এই টাকাটা দিই তাহলে মাসের শেষে হয়ত আমাকেই অন্যের কাছ থেকে ধার চাইতে হবে। কিন্তু আমি কিছুতেই তাকে না বলতে পারলাম না। 😛

আমি কিছু লোক কে দেখেছি যারা অনেক সুন্দর করে না বলতে পারেন। দেশে আমি প্রথম একটা কলেজে চাকুরী দিয়ে আমার কর্মজীবন শুরু করি। সেই কলেজের যিনি কর্ণধার, নাম বললে হয়ত অনেকেই চিনবেন; এই ভদ্রলোকের অধীনে স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি-ওষুধ কোম্পানি মিলে প্রায় হাজার খানিক মানুষ কাজ করে। ভদ্রলোকের স্ট্রাটিজি-ই হচ্ছে কম বেতন দিয়ে অধিক পরিশ্রম করান। বলতে গেলে ১০০% এমপ্লয়ী বেতন সংক্রান্ত ব্যাপারে তার উপর ক্ষেপা।

কিন্তু ভদ্রলোক তার ব্যবহার এমন একটা পর্যায়ে উন্নিত করেছেন যে তার সামনে গিয়ে কেও কোন কিছু বলতে পারে না। বরং তার সাথে কিছুক্ষন কথা বললে মন ভাল হয়ে যায়। এই ভদ্রলোক কাওকে কখনো না বলেন না। কিন্তু এতগুলো মানুষকে সামলাতে গিয়ে নিশ্চয় তাকে অনেক না বলার মত কাজ প্রতিনিত করতে হয়। কেও তার কাছে বেতন বাড়ানোর আর্জি নিয়ে গেলে তিনি এত সুন্দর করে তাকে বুঝিয়ে দিতেন যেন সে নিজেই লজ্জা পেয়ে যেত এমন অন্যায্য আবদার করার জন্য। উনি কাওকে চাকুরি থেকে স্যাক করেন না, কিন্তু কাওকে অপছন্দ হলে তাকে এমন একটা কাজ দেন যেন সে নিজেই চাকুরী ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

এই ব্যবস্থা আছে জাপানেও; সেখানে সাধারণত কাওকে কাজ থেকে বের করে দেওয়া হয় না। কিন্তু কাওকে আর না রাখতে চাইলে এমন ভাবে প্রেশার সৃষ্টি করা হয় যেন সে নিজে থেকেই চাকুরী ছাড়তে বাধ্য হয়। জাপানীজ ভদ্রলোকেরা সাধারণত কাওকে সরাসরি না বলেনা। আপনাকে তারা এত সুন্দর করে না বলবে যে আপনি তাদের কালচারে অভ্যস্ত না হলে বুঝতেই পারবেন না যে সে আপনাকে না বল্ল, নাকি হ্যাঁ বল্ল! একজন চাকুরী প্রার্থী জাপানে স্কুলের চাকুরী খুজতে প্রায় ২০-২৫ টি স্কুলে ভাইভা দিয়েছিল। প্রতিটা ভাইভা দেওয়ার সময় এমন ভাবে তার প্রশংসা করত যে সে নিশ্চিত ভাবে ধরে নিত তার এইখানে চাকুরী মাষ্ট! কিন্তু দিন যায় কোন রিপ্লায় আসেনা, অবশেষে অধর্য্য হয়ে যোগাযোগ করলে এমন বিনীত ভাবে রিপ্লায় আসত যে ইমেইল পড়ে সে সন্দিহান হতো যে আসলে কি না বলা হয়েছে নাকি হ্যাঁ বলা হয়েছে।

সুন্দর করে না বলতে পারাটা আপনার ভদ্রতা এবং একই সাথে স্মারটনেসের মাপ কাঠি – আসুন সুন্দর করে “না” বলতে শিখি!

Author

Write A Comment